ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের কনিকান্দা গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ঐতিহ্যবাহী তিনটি সরকারি ভবন। যার মধ্যে রয়েছে সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়, একটি কমিউনিটি সেন্টার এবং একটি কৃষি অফিস। এলাকার নথিপত্র ও স্থানীয় বয়োবৃদ্ধদের তথ্যমতে, ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান আমলে এই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন তিনটি নির্মিত হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে চরম অবহেলা আর অকার্যকর অবস্থায় পড়ে থাকা এই মূল্যবান রাষ্ট্রীয় সম্পদগুলো সংস্কার এবং নিজেদের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী নির্বাচনী ভোটকেন্দ্র ফিরে পাওয়ার দাবিতে এবার সোচ্চার হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৬১ সালে আজিমনগর ইউনিয়নের তৎকালীন দূরদর্শী, দানবীর ও সাবেক সফল চেয়ারম্যান মরহুম কোহেল উদ্দিন হাজী সাহেবের আমলে এই ভবন তিনটি নির্মিত হয়েছিল। এই মূল্যবান জমিগুলোও ছিল খোদ কোহেল উদ্দিন চেয়ারম্যান সাহেবের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এলাকার উন্নয়ন এবং সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে এই দূরদর্শী জনপ্রতিনিধি নিজের পৈত্রিক সম্পত্তি তৎকালীন সরকারের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়েছিলেন, যেন এলাকার মানুষ এক জায়গা থেকেই ইউনিয়ন পরিষদ, কৃষি ও সামাজিক সেবা পেতে পারে। আজ তিনি বেঁচে না থাকলেও তার রেখে যাওয়া এই অনন্য কীর্তি কনিকান্দাবাসী শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
এই ঐতিহাসিক ভবন প্রাঙ্গণেই একসময় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচন, জাতীয় সংসদের এমপি নির্বাচনসহ সব ধরনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতো। স্থানীয়দের ভাষায় যা ‘রাজার ভোট’ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু প্রায় ১০-১৫ বছর আগে এই কেন্দ্রটি অন্য জায়গায় স্থানান্তর করায় চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে এলাকাবাসীর মধ্যে।
"আমি ৩ নং ওয়ার্ডের মেম্বার। অনেক বছর আগে এই কনিকান্দা ভোটকেন্দ্রে ‘রাজার ভোট’ হইতো। এখন বহু বছর ধরে আর এখানে ভোট হয় না। ১৫-২০ বছর আগে কেন্দ্রটি কেটে তারাইল আলিয়া মাদ্রাসায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমাদের কেন্দ্রটি যদি আবার কনিকান্দায় ফিরিয়ে আনা যায়, তবে আমাদের সবার জন্য খুব ভালো হয়। আমাদের প্রিয় এমপি মহোদয় বাবলু ভাইয়ের কাছে আমাদের দাবি, কনিকান্দায় যেন এই সেন্টারটি আবারো ফিরিয়ে দেওয়া হয়। আমরা ইতিমধ্যে এমপি মহোদয়ের কাছে আবেদন জানিয়েছি।"
একই সুরে ক্ষোভ ও দাবি প্রকাশ করে সাবেক বিএনপি'র সহ-সভাপতি *আব্দুল হালিম মাতুব্বর বলেন, ফরিদপুর-৪ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় নেতৃবৃন্দের কাছে আমার আবেদন—স্বাধীনতার আগে থেকেই এই সেন্টারে রাজার ভোট, এমপির ভোট, উপজেলার ভোট ও ইউনিয়ন পরিষদের ভোট হইতো। কিন্তু বিগত ১০-১৫ বছর আগে তারাইল মাদ্রাসার সুপার ও প্রিন্সিপাল ইব্রাহিম সাহেব কূটকৌশল করে এই কেন্দ্রটি কেটে তারাইল ইশসুদ্দি মাদ্রাসায় নিয়ে গেছেন। এখন এখানে শুধু ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার ও চেয়ারম্যানের ভোট হয়। এমপি সাহেবের কাছে আমাদের আকুল আবেদন ও জোর দাবি—আমরা যেন আগে যেভাবে এখানে রাজার ভোটসহ সব ভোট ditaম, পুরো গ্রামবাসী মিলে আমাদের সেই ঐতিহ্যবাহী সেন্টারটি আমরা এখানে ফেরত চাই।"
সাধারণ এলাকাবাসী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গও একই দাবি তুলে ধরে বলেন,
আমাদের একমাত্র দাবি হলো—হারানো সেন্টার আমরা ফেরত চাই। ১০-১৫ বছর আগে আমাদের কাছ থেকে এটি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এখন আমাদের স্পষ্ট দাবি—রাজার ভোট, এমপির ভোট, উপজেলার ভোট ও ইউনিয়ন পরিষদের কাউন্সিলের ভোটসহ সব ভোট আমরা পুনরায় এই কনিকান্দার বুথেই দিতে চাই।"
জনপ্রতিনিধির উদাসীনতা বনাম প্রবাসী ইমরান হাওলাদারের মানবিক উদ্যোগ
ঐতিহাসিক এই তিনটি সরকারি ভবন দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত থাকায় চারপাশ লতাপাতা, জঙ্গল আর আগাছায় ছেয়ে ভূতুড়ে এলাকায় পরিণত হয়েছিল। বর্তমান ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের চোখে এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় কোনো নজরদারি না থাকলেও, এগিয়ে এসেছেন আজিমনগর ইউনিয়নের আগামী দিনের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, সমাজসেবক ও সৌদি প্রবাসী ইমরান হাওলাদার।
তার অর্থায়ন ও সাহসিকতায় অনুপ্রাণিত হয়ে পুরো কনিকান্দা গ্রাম আজ ঐক্যবদ্ধ। ইমরান হাওলাদারের দেওয়া আর্থিক সহায়তার আশ্বাসে পুরো প্রক্রিয়ায় সার্বিক সহযোগিতায় ছিলেন ও মূল ভূমিকা পালন করেছেন স্থানীয় ব্যক্তিত্ব মঞ্জু হাওলাদার। তিনি নিজস্ব কিষাণ (শ্রমিক) সাথে নিয়ে এবং নিজে উপস্থিত থেকে দিনরাত পরিশ্রম করে ভবনগুলোর চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজ সম্পন্ন করেছেন। ইমরান হাওলাদার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এই ভবনগুলোর দরজা-জানালা মেরামতসহ যা কিছু প্রয়োজন, সব খরচ তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বহন করবেন।
স্থানীয় সচেতন ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের বর্তমান চেয়ারম্যান পদে থেকেও এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনের দিকে কোনো নজর দেননি। আমরা বর্তমান এমপি মহোদয়ের কাছে জোর আবেদন জানাই, ১৯৬১ সালের এই ঐতিহাসিক স্থানে যেন সরকারি উদ্যোগে একটি দৃষ্টিনন্দন ও বড় কোনো বহুতল সরকারি ভবন বা কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়।
একই সাথে এলাকাবাসী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আগামীতে যদি প্রবাসী ইমরান হাওলাদার এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন, তবে কনিকান্দাসহ পুরো আজিমনগর ইউনিয়নের উন্নয়নের সকল ঘাটতি পূরণ হবে এবং এলাকার চেহারাই বদলে যাবে।
১৯৬১ সালের স্মৃতিবিজড়িত এই সরকারি সম্পদ রক্ষা এবং নিজেদের হৃত গৌরব (ভোটকেন্দ্র) ফিরে পেতে এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা ও প্রশাসনের সদিচ্ছার দিকে তাকিয়ে আছে কনিকান্দার হাজারো মানুষ।
প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন: কনিকান্দা গ্রামের স্থানীয় সচেতন মহল ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, আজিমনগর।